অফিসে নেই কর্মকর্তারা: শিক্ষা ভবনে সচিবের সারপ্রাইজ ভিজিটে তোলপাড়
শিক্ষা প্রশাসনের কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে পরিচিত ‘শিক্ষা ভবন’ (মাউশি অধিদপ্তর) আজ এক নজিরবিহীন ঘটনার সাক্ষী হয়েছে। সাধারণ মানুষের সেবা নিশ্চিত করতে এবং কর্মকর্তাদের কর্মতৎপরতা যাচাই করতে আজ ৮ এপ্রিল ২০২৬, বুধবার সকালে শিক্ষা ভবনে আকস্মিক বা ঝটিকা অভিযান পরিচালনা করেছেন মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের সচিব।
পরিদর্শনকালে সচিব দেখতে পান যে, অফিস শুরুর দীর্ঘ সময় পরেও অনেক গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তা তাদের ডেস্কে নেই। এমনকি অনেক দপ্তরে সাধারণ মানুষ দূর-দূরান্ত থেকে এসে সেবার জন্য অপেক্ষা করলেও দায়িত্বপ্রাপ্তদের খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। এই পরিস্থিতিতে সচিব চরম ক্ষোভ প্রকাশ করেন এবং তাৎক্ষণিকভাবে অনুপস্থিত কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেন।
অভিযানে যা যা পাওয়া গেল: অব্যবস্থাপনার চালচিত্র
সচিবের এই ঝটিকা অভিযানে বেশ কিছু গুরুতর অনিয়ম উঠে এসেছে: ১. দেরিতে উপস্থিতি: অফিস সময় ৯টা হলেও অনেক উর্ধ্বতন কর্মকর্তা ও কর্মচারী ১০টার পরেও অফিসে পৌঁছাননি। ২. নথিপত্র জট: অনেক কর্মকর্তার টেবিলে শিক্ষকদের বদলি, অবসর সুবিধা এবং এমপিও সংক্রান্ত ফাইল মাসের পর মাস ঝুলে থাকতে দেখা গেছে। ৩. সেবাপ্রার্থীদের ভোগান্তি: দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা শিক্ষকরা অভিযোগ করেছেন যে, কর্মকর্তাদের দেখা না পেয়ে তারা দিনের পর দিন হয়রানির শিকার হচ্ছেন। ৪. ফাঁকিবাজি: হাজিরা খাতায় সই থাকলেও অনেককে তাদের ডেস্কে পাওয়া যায়নি, যা সরাসরি শৃঙ্খলা পরিপন্থী।
সচিবের কড়া হুশিয়ারি ও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা
পরিদর্শন শেষে সচিব মাউশি অধিদপ্তরের মহাপরিচালকসহ অন্য কর্মকর্তাদের সাথে এক জরুরি বৈঠকে বসেন। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, “জনগণ ট্যাক্সের টাকা দিয়ে আমাদের বেতন দেয়। অফিসে বসে ফাঁকিবাজি করার দিন শেষ। যারা সময়মতো অফিসে আসবেন না, তাদের বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি গ্রহণ করা হবে।”
সচিবের নির্দেশ অনুযায়ী:
- শো-কজ (Show-cause): অনুপস্থিত সকল কর্মকর্তাকে আগামী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
- বিভাগীয় মামলা: বারবার নিয়ম ভঙ্গকারীদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা ও বেতন কর্তনের মতো কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।
- ডিজিটাল মনিটরিং: এখন থেকে প্রতিটি দপ্তরের কর্মকর্তাদের গতিবিধি ডিজিটাল পদ্ধতিতে মনিটর করা হবে।
১৮০ দিনের অগ্রাধিকার কর্মসূচি ও স্মার্ট প্রশাসন
শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলনের ঘোষিত ১৮০ দিনের বিশেষ অগ্রাধিকার কর্মসূচির অন্যতম মূল লক্ষ্য হলো শিক্ষা প্রশাসনকে দুর্নীতিমুক্ত ও গতিশীল করা। ১. সিসিটিভি ও স্বচ্ছতা: মন্ত্রী মিলন স্পষ্ট করেছেন যে, শিক্ষা ভবনের প্রতিটি তলায় স্থাপিত সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজ সরাসরি মন্ত্রণালয় থেকে পর্যবেক্ষণ করা হবে। কর্মকর্তাদের হাজিরা এবং ডেস্কে থাকার বিষয়টি এখন ডিজিটাল মনিটরিংয়ের আওতায়। ২. স্মার্ট নিয়োগ ও সেবা: এনটিআরসিএ-র মাধ্যমে বর্তমানে ১৩ হাজার প্রতিষ্ঠান প্রধান নিয়োগের যে বিশাল কাজ চলছে, তাতে যেন কোনো ফাইল আটকে না থাকে, সেজন্য সচিব এই কঠোর অবস্থান নিয়েছেন। ৩. ফ্রি ড্রেস বিতরণ তদারকি: সরকার যখন ২ লাখ সুবিধাবঞ্চিত শিক্ষার্থীর মাঝে ফ্রি ড্রেস ও কেডস বিতরণ করছে এবং মাঠ পর্যায়ে কাজ করছে, তখন সদর দপ্তরের কর্মকর্তাদের এমন গাফিলতি কোনোভাবেই মেনে নেওয়া হবে না।
২০ Eskimo৬ ও ২০ Eskimo৭ সালের শিক্ষা সংস্কারের লক্ষ্য
২০ Eskimo৬ ও ২০ Eskimo৭ সালের এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষার সময় পরিবর্তন এবং ২০২৭ সাল থেকে পরীক্ষা ডিসেম্বরে নেওয়ার যে মহাপরিকল্পনা রয়েছে, তা সফল করতে হলে শিক্ষা প্রশাসনকে দিনরাত কাজ করতে হবে। সচিব জানান, “আমরা যখন শিক্ষা ব্যবস্থাকে বিশ্বমানে নিয়ে যেতে চাচ্ছি, তখন কর্মকর্তাদের এই পুরনো মানসিকতা বড় বাধা। স্মার্ট বাংলাদেশের জন্য আমাদের স্মার্ট ও দক্ষ অফিস কালচার প্রয়োজন।”
(উল্লেখ্য যে, সম্প্রতি সরকারি চাকরির বয়সসীমা ৩২ বছর করা হয়েছে, যার ফলে নতুন প্রজন্মের অনেক মেধাবী তরুণ প্রশাসনে আসছেন। সচিব মনে করেন, অভিজ্ঞদের পাশাপাশি তরুণদের কর্মস্পৃহা কাজে লাগিয়ে শিক্ষা ভবনের স্থবিরতা দূর করা সম্ভব)।
শিক্ষক রাজনীতি ও জনমত
সাম্প্রতিক এক জরিপে দেখা গেছে, ৭৬ শতাংশ মানুষ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ও শিক্ষা প্রশাসনে রাজনৈতিক প্রভাবের বিপক্ষে। সাধারণ মানুষের মতে, শিক্ষা ভবনে অনেক সময় রাজনৈতিক সুপারিশের কারণে যোগ্য শিক্ষকরা হয়রানির শিকার হন। সচিবের এই ঝটিকা অভিযান সাধারণ শিক্ষকদের মনে আশার সঞ্চার করেছে। তারা মনে করছেন, দালালের দৌরাত্ম্য ও ফাইল আটকে রাখার সংস্কৃতি এবার বন্ধ হবে।
উপসংহার: শৃঙ্খলার পথে শিক্ষা ভবন
শিক্ষা ভবনে সচিবের এই ঝটিকা অভিযান কেবল একটি দিনের ঘটনা নয়, এটি শিক্ষা প্রশাসনে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার একটি বড় বার্তা। ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলনের নেতৃত্বে পরিচালিত আধুনিক ও স্মার্ট শিক্ষা ব্যবস্থার লক্ষ্য হলো প্রতিটি শিক্ষক ও শিক্ষার্থীকে হয়রানিমুক্ত সেবা প্রদান করা। সঠিক তদারকি ও জবাবদিহিতার মাধ্যমেই গড়ে উঠবে ২০ Eskimo৬ সালের সমৃদ্ধ ও স্মার্ট বাংলাদেশ।
