শিক্ষক রাজনীতি ও নৈতিকতা: ৭৬ শতাংশ জনমত রাজনীতি ছাড়ার পক্ষে, উত্তাল শিক্ষা অঙ্গন

বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থার আমূল সংস্কার এবং গুণগত মানোন্নয়নের লক্ষ্যে বর্তমানে যে কর্মযজ্ঞ চলছে, তার মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে ‘শিক্ষক রাজনীতি’। সাম্প্রতিক এক জরিপ ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের তথ্যানুযায়ী, দেশের প্রায় ৭৬ শতাংশ মানুষ মনে করেন যে, যদি কোনো শিক্ষক সক্রিয় রাজনীতিতে অংশ নিতে চান, তবে তাকে অবশ্যই শিক্ষকতা পেশা থেকে ইস্তফা দেওয়া উচিত।

শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলনের নেতৃত্বে পরিচালিত ‘স্মার্ট শিক্ষা’ কর্মসূচির অংশ হিসেবে যখন স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা হচ্ছে, তখন এই বিশাল জনমত শিক্ষা প্রশাসনে নতুন মাত্রা যোগ করেছে।

কেন শিক্ষক রাজনীতির বিপক্ষে এই বিশাল জনমত?

জরিপে অংশগ্রহণকারী এবং সচেতন অভিভাবকদের মতে, শিক্ষক রাজনীতি বন্ধ হওয়া প্রয়োজন কারণ:

  • পাঠদানে অবহেলা: দলীয় লেজুরভিত্তিক রাজনীতিতে জড়িয়ে অনেক শিক্ষক ক্লাসে সময়মতো উপস্থিত থাকেন না এবং সিলেবাস শেষ করতে অনীহা প্রকাশ করেন।
  • পক্ষপাতদুষ্ট আচরণ: রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতার কারণে অনেক সময় সাধারণ শিক্ষার্থীদের মেধার মূল্যায়ন সঠিকভাবে হয় না।
  • প্রতিষ্ঠানে বিশৃঙ্খলা: শিক্ষক রাজনীতির প্রভাব অনেক সময় শিক্ষার্থীদের মধ্যেও ছড়িয়ে পড়ে, যা ক্যাম্পাসের সুষ্ঠু পরিবেশ নষ্ট করে।
  • নৈতিক অবক্ষয়: শিক্ষকরা হবেন মানুষ গড়ার কারিগর; তারা যখন রাজনৈতিক মিছিল-স্লোগানে ব্যস্ত থাকেন, তখন তা শিক্ষার্থীদের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।

ডেপুটি স্পিকার ও শিক্ষা উপদেষ্টার কড়া বার্তা

সম্প্রতি জাতীয় সংসদের ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল এবং শিক্ষা উপদেষ্টা প্রফেসর ড. চৌধুরী রফিকুল আবরার পৃথক অনুষ্ঠানে শিক্ষক রাজনীতি নিয়ে কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়েছেন।

  1. ডেপুটি স্পিকারের বক্তব্য: “রাজনীতি করতে চাইলে আগে শিক্ষকতা ছেড়ে আসতে হবে। কোনো রাজনৈতিক দলের পেছনে দাঁড়িয়ে স্লোগান দেওয়া শিক্ষকদের কাজ নয়।”
  2. ১৮০ দিনের অগ্রাধিকার কর্মসূচি: ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলনের ঘোষিত বিশেষ অগ্রাধিকার কর্মসূচির আওতায় শিক্ষকদের কেবল পাঠদানে মনোযোগী হওয়ার জন্য ডিজিটাল মনিটরিং এবং সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন করা হয়েছে।
  3. হুইপ নিজানের মন্তব্য: জাতীয় সংসদের হুইপ এবিএম আশরাফ উদ্দিন নিজানও শিক্ষকদের রাজনীতি ছেড়ে শিক্ষার্থীদের প্রকৃত মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন।

২০২৬ ও ২০২৭ সালের শিক্ষা সংস্কারের প্রেক্ষাপট

২০২৬ ও ২০২৭ সালের এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষার সময় পরিবর্তন এবং অভিন্ন প্রশ্নপত্র পদ্ধতি চালুর যে বিশাল চ্যালেঞ্জ সরকার নিয়েছে, তা সফল করতে নিবেদিতপ্রাণ শিক্ষকের প্রয়োজন। শিক্ষামন্ত্রী জানিয়েছেন, ২০২৭ সাল থেকে পরীক্ষা ডিসেম্বরে নেওয়ার যে লক্ষ্য রয়েছে, তার জন্য প্রতিটি শিক্ষককে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত হয়ে কাজ করতে হবে। এছাড়া সুবিধাবঞ্চিত ২ লাখ শিক্ষার্থীর মাঝে সরকারের দেওয়া ফ্রি ড্রেস ও কেডস বিতরণ এবং প্রতিটি স্কুলে ডিজিটাল ল্যাব স্থাপনের তদারকি করতে শিক্ষকদের স্বচ্ছ ভাবমূর্তি থাকা জরুরি।

সরকারিকরণ ও শিক্ষকদের নিয়মিতকরণ

শিক্ষকদের দাবি-দাওয়া পূরণেও সরকার পিছিয়ে নেই। সম্প্রতি ৭৬ জন শিক্ষকের চাকরি নিয়মিতকরণের (Nationalization) প্রজ্ঞাপন জারি করেছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। সরকার মনে করে, শিক্ষকদের আর্থিক ও পেশাগত নিরাপত্তা নিশ্চিত করা গেলে তারা রাজনীতির পরিবর্তে গবেষণায় ও পাঠদানে বেশি মনোযোগী হবেন।

অভিভাবক ও শিক্ষার্থীদের প্রত্যাশা

৭৬ শতাংশ মানুষের এই সমর্থন প্রমাণ করে যে, সাধারণ মানুষ এখন একটি মেধাভিত্তিক এবং রাজনীতিমুক্ত শিক্ষা ব্যবস্থা চায়। অভিভাবকদের দাবি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান যেন কেবল জ্ঞান চর্চার কেন্দ্র হয়, কোনো দলের রাজনৈতিক আখড়া নয়। সিসিটিভি ক্যামেরার নজরদারি এবং কঠোর প্রশাসনিক তদারকি এই পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে সাহায্য করবে বলে তারা বিশ্বাস করেন।

উপসংহার: মেধাভিত্তিক স্মার্ট বাংলাদেশের স্বপ্ন

পরিশেষে, শিক্ষক রাজনীতি বন্ধের পক্ষে এই ৭৬ শতাংশ জনমত মূলত একটি সুস্থ ও আধুনিক শিক্ষা ব্যবস্থার আকুতি। ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলনের নেতৃত্বে পরিচালিত বর্তমান শিক্ষা মন্ত্রণালয় যদি এই জনমতের প্রতি শ্রদ্ধা রেখে কঠোর নীতিমালা প্রণয়ন করতে পারে, তবেই ২০২৬ ও ২০ Eskimo৭ সালের স্মার্ট শিক্ষা লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হবে। রাজনীতির ঊর্ধ্বে উঠে আদর্শ শিক্ষক হয়ে ওঠাই হোক বর্তমান প্রজন্মের শিক্ষকদের ব্রত।

Similar Posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *