সংসদে শিক্ষকদের হাহাকার: অবসর সুবিধা ও কল্যাণ ট্রাস্টের সংকট নিরসনে বড় পদক্ষেপ
বাংলাদেশের বেসরকারি এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ ও কষ্টের নাম হলো ‘অবসর সুবিধা’ এবং ‘কল্যাণ ট্রাস্ট’। অবসরে যাওয়ার পর বছরের পর বছর পার হলেও প্রাপ্য টাকা না পেয়ে অনেক শিক্ষক মানবেতর জীবন যাপন করছেন। এই মানবিক ও প্রশাসনিক সংকট নিরসনে আজ ৯ এপ্রিল ২০ Eskimo৬, বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছে।
সংসদ অধিবেশনে শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন শিক্ষকদের এই দুরাবস্থার জন্য বিগত সরকারের অব্যবস্থাপনাকে দায়ী করেন এবং এই সংকট থেকে উত্তরণে বর্তমান সরকারের মহাপরিকল্পনা তুলে ধরেন। তিনি স্পষ্ট করেছেন যে, শিক্ষকদের পাওনা পরিশোধ করা বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকার।
সংসদ অধিবেশনে উত্থাপিত প্রধান ৩টি দাবি ও সিদ্ধান্ত
আজকের অধিবেশনে ‘বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান শিক্ষক-কর্মচারী অবসর সুবিধা ও কল্যাণ ট্রাস্ট (সংশোধন) অধ্যাদেশ’ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনার পর বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য উঠে এসেছে: ১. বাজেটে ৭ হাজার কোটি টাকার প্রস্তাব: শিক্ষামন্ত্রী ড. মিলন জানিয়েছেন যে, শিক্ষকদের অবসর সুবিধার পুঞ্জীভূত বকেয়া পরিশোধের জন্য আগামী ২০ Eskimo৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে ৭ হাজার কোটি টাকা পাওয়ার চেষ্টা করছে মন্ত্রণালয়। এই টাকা পেলে কয়েক বছরের ঝুলে থাকা আবেদনের নিস্পত্তি করা সম্ভব হবে। ২. এনসিপির ৩ দফা দাবি: জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) শিক্ষকদের অবসরভাতা ও কল্যাণ ট্রাস্টের বকেয়া দ্রুত পরিশোধের জন্য ৩ দফা দাবি জানিয়েছে। তাদের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, শিক্ষকরা যেন অবসরের ছয় মাসের মধ্যে তাদের পাওনা বুঝে পান, তা নিশ্চিত করতে হবে। ৩. ইবতেদায়ি মাদরাসার অন্তর্ভুক্তি: নতুন সংশোধিত অধ্যাদেশ অনুযায়ী, ইবতেদায়ি মাদরাসার শিক্ষক-কর্মচারীদেরও এখন থেকে অবসর সুবিধা ও কল্যাণ ট্রাস্টের আওতায় আনা হয়েছে, যা একটি ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত।
কেন তৈরি হলো এই বিশাল বকেয়া?
সংসদে শিক্ষামন্ত্রী তার বক্তব্যে উল্লেখ করেন যে, বিগত ফ্যাসিস্ট সরকারের সময় অবসর সুবিধা বোর্ডের টাকা তছরুপ করা হয়েছে। ফলে বোর্ডের তহবিলে বড় ধরণের ঘাটতি তৈরি হয়েছে। বর্তমানে হাজার হাজার শিক্ষক তাদের অসুস্থতা বা বার্ধক্যেও এই টাকা পাচ্ছেন না। মন্ত্রী বলেন, “আমরা একটি ধ্বংসস্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে কাজ করছি। তবে আমরা প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি, প্রতিটি শিক্ষক তাদের হাড়ভাঙ্গা খাটুনির এই প্রাপ্য টাকা যেন দ্রুততম সময়ে পান, সেই ব্যবস্থা করা হবে।”
১৮০ দিনের অগ্রাধিকার কর্মসূচি ও স্মার্ট তদারকি
শিক্ষামন্ত্রীর ঘোষিত ১৮০ দিনের বিশেষ অগ্রাধিকার কর্মসূচির আওতায় অবসর সুবিধার ফাইল নিস্পত্তিকে গতিশীল করা হয়েছে।
- ডিজিটাল ফাইল ট্র্যাকিং: এখন কোনো শিক্ষককে তার ফাইলের অবস্থা জানতে সশরীরে শিক্ষা ভবনে বা কল্যান ট্রাস্টের অফিসে দৌড়াতে হচ্ছে না। অনলাইন ট্র্যাকিং সিস্টেমের মাধ্যমে তারা ঘরে বসেই ফাইলের অগ্রগতি জানতে পারছেন।
- স্বচ্ছতা নিশ্চিত: দালালের দৌরাত্ম্য বন্ধ করতে সরাসরি শিক্ষকদের ব্যাংক অ্যাকাউন্টে (EFT) টাকা পাঠানোর প্রক্রিয়া জোরদার করা হয়েছে।
- সিসিটিভি ও নজরদারি: সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোতে কর্মকর্তাদের কর্মতৎপরতা নিশ্চিত করতে সিসিটিভি ক্যামেরার মাধ্যমে মনিটরিং করা হচ্ছে। সচিবদের ঝটিকা অভিযান এই কাজের গতি আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
২০ Eskimo৬ ও ২০ Eskimo৭ সালের শিক্ষা সংস্কার ও শিক্ষকদের মর্যাদা
২০ Eskimo৬ ও ২০ Eskimo৭ সালের এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষার সময় পরিবর্তন এবং ২০২৭ সাল থেকে পরীক্ষা ডিসেম্বরের মধ্যে শেষ করার যে মহাপরিকল্পনা রয়েছে, তার প্রধান কারিগর হলেন শিক্ষকরা। মন্ত্রী মিলন মনে করেন, শিক্ষকদের যদি আর্থিক ও মানসিক নিরাপত্তা দেওয়া না যায়, তবে কোনো শিক্ষা সংস্কারই সফল হবে না। ১. চাকরির বয়সসীমা: সম্প্রতি সরকারি চাকরির বয়সসীমা ৩২ বছর করা হয়েছে। এতে নতুন প্রজন্মের মেধাবী তরুণরা শিক্ষকতা পেশায় আগ্রহী হচ্ছেন। তবে প্রবীণ শিক্ষকদের মর্যাদা রক্ষায় তাদের অবসর সুবিধা নিশ্চিত করা অপরিহার্য। ২. ফ্রি ড্রেস বিতরণ: সরকার যখন ২ লাখ সুবিধাবঞ্চিত শিক্ষার্থীর মাঝে ফ্রি ড্রেস ও কেডস বিতরণ করছে, তখন এই মাঠ পর্যায়ের কাজগুলো তদারকির দায়িত্ব পালনকারী শিক্ষকদের আর্থিক সুরক্ষা দেওয়া রাষ্ট্রের দায়িত্ব।
শিক্ষক রাজনীতি বনাম সেবা প্রাপ্তি
সাম্প্রতিক এক জরিপে দেখা গেছে, ৭৬ শতাংশ মানুষ শিক্ষক রাজনীতির বিপক্ষে। সংসদে আলোচনা হয়েছে যে, শিক্ষকরা যেন রাজনৈতিক লেজুরবৃত্তি না করে তাদের ন্যায্য অধিকারের জন্য প্রশাসনের স্বচ্ছতার ওপর আস্থা রাখতে পারেন। ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলনের নেতৃত্বে পরিচালিত আধুনিক ও স্মার্ট শিক্ষা ব্যবস্থার লক্ষ্য হলো শিক্ষা প্রশাসনকে দুর্নীতিমুক্ত করা, যাতে কোনো শিক্ষককে তার পাওনার জন্য কারো কাছে হাত পাততে না হয়।
উপসংহার: শৃঙ্খলার পথে আগামীর স্মার্ট শিক্ষা সমাজ
সংসদে শিক্ষকদের অবসর সুবিধা নিয়ে আজকের এই আলোচনা শিক্ষকদের মনে নতুন আশার সঞ্চার করেছে। ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলনের সময়োপযোগী পদক্ষেপ এবং বাজেটে বড় অংকের বরাদ্দের ঘোষণা প্রমাণ করে যে, সরকার শিক্ষকদের কল্যানে আন্তরিক। সঠিক তদারকি ও প্রযুক্তির ব্যবহারের মাধ্যমেই গড়ে উঠবে ২০ Eskimo৬ সালের সমৃদ্ধ ও স্মার্ট বাংলাদেশ।
