প্রাথমিক বৃত্তি পরীক্ষা ২০২৬: ৪০০ নম্বরের নতুন পদ্ধতিতে ১৫ এপ্রিল থেকে পরীক্ষা শুরু, মাউশি ও ডিপিই-র জরুরি নির্দেশিকা জারি
বাংলাদেশের প্রাথমিক শিক্ষা স্তরের শিক্ষার্থীদের মেধা মূল্যায়নের সবচেয়ে বড় মাধ্যম ‘প্রাথমিক বৃত্তি পরীক্ষা’ নিয়ে একগুচ্ছ নতুন নির্দেশনা জারি করেছে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর (DPE)। আজ ২৫ মার্চ ২০২৬, বুধবার প্রকাশিত সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, এবারের পরীক্ষা কেবল তারিখের দিক থেকেই নয়, বরং মান বণ্টন এবং ব্যবস্থাপনার দিক থেকেও আমূল পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। আইনি জটিলতা ও নীতিমালার পরিবর্তনের কারণে গত বছর যে পরীক্ষাটি স্থগিত ছিল, সেটিও এবার নতুন নীতিমালার আলোকে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে।
৪০০ নম্বরের নতুন পরীক্ষা পদ্ধতি ও মান বণ্টন
এবারের প্রাথমিক বৃত্তি পরীক্ষার সবচেয়ে বড় চমক হলো এর নম্বর বণ্টন। নতুন নীতিমালা অনুযায়ী, পরীক্ষাটি মোট ৪০০ নম্বরের ওপর ভিত্তি করে অনুষ্ঠিত হবে। আগে যেখানে ১০০ নম্বরের একটি সমন্বিত পরীক্ষা হতো, সেখানে এবার প্রতিটি বিষয়ের গভীরতা যাচাইয়ে নম্বর বাড়ানো হয়েছে।
বিষয়ভিত্তিক নম্বর বিভাজন:
- বাংলা: ১০০ নম্বর
- ইংরেজি: ১০০ নম্বর
- প্রাথমিক গণিত: ১০০ নম্বর
- প্রাথমিক বিজ্ঞান এবং বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয় (সমন্বিত): ১০০ নম্বর (প্রতিটি ৫০ নম্বর করে)
বিশেষ দ্রষ্টব্য: প্রতিটি বিষয়ের পরীক্ষার জন্য বরাদ্দ থাকবে ২ ঘণ্টা ৩০ মিনিট। তবে বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন পরীক্ষার্থীরা অতিরিক্ত ৩০ মিনিট সময় পাবেন। বৃত্তি পাওয়ার জন্য একজন শিক্ষার্থীকে প্রতিটি বিষয়ে ন্যূনতম ৪০ শতাংশ নম্বর পেতে হবে।
গুরুত্বপূর্ণ তারিখ ও প্রশাসনিক তথ্য
প্রাথমিক বৃত্তি পরীক্ষার ফরম পূরণ, ডাটা এন্ট্রি ও প্রবেশপত্র সংক্রান্ত মূল সময়সূচি নিচে তুলে ধরা হলো:
- তথ্য প্রকাশের তারিখ: ২৫ মার্চ ২০২৬ (বুধবার)।
- প্রবেশপত্র সংগ্রহের সময়সীমা: ৬ এপ্রিল থেকে ১৩ এপ্রিল ২০২৬।
- বৃত্তি পরীক্ষার সম্ভাব্য তারিখ: ১৫ এপ্রিল থেকে ১৮ এপ্রিল ২০২৬।
- তথ্য অনুসন্ধানের অফিশিয়াল মাধ্যম: প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের সেন্ট্রাল ই-সার্ভার ও (অফিসিয়াল ওয়েবসাইট)।
প্রবেশপত্র ডাউনলোড ও ডাটা এন্ট্রির প্রশাসনিক ধাপসমূহ
অধিদপ্তরের নতুন নির্দেশনায় বেসরকারি বিদ্যালয়ের পরীক্ষার্থীদের তথ্য (DR) IPEMIS সফটওয়্যারে এন্ট্রি এবং প্রবেশপত্র প্রিন্টের সুনির্দিষ্ট সময়সীমা ও ধাপ ঘোষণা করা হয়েছে:
- ডাটা এন্ট্রি ও যাচাই: সংশ্লিষ্ট বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক বা সহকারী উপজেলা শিক্ষা অফিসারদের মাধ্যমে IPEMIS পোর্টালে ডাটা এন্ট্রির কাজ দ্রুত সম্পন্ন করতে হবে। কোনো প্রকার আমলাতান্ত্রিক শিথিলতা বা ফাইল আটকে রাখা বরদাশত করা হবে না।
- কেন্দ্র নির্বাচন: ২৬-২৮ মার্চের মধ্যে সংশ্লিষ্ট উপজেলা/থানা শিক্ষা অফিসাররা স্ব-স্ব এলাকার পরীক্ষার কেন্দ্র নির্বাচন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করবেন।
- পরীক্ষক এন্ট্রি: ২৯ মার্চ থেকে ২ এপ্রিলের মধ্যে যোগ্য পরীক্ষক ও নিরীক্ষকদের তথ্য ডাটাবেজে এন্ট্রি করতে হবে।
- প্রবেশপত্র সংগ্রহ: শিক্ষার্থীরা তাদের নিজ নিজ প্রবেশপত্র আগামী ৬ এপ্রিল থেকে ১৩ এপ্রিল পর্যন্ত অনলাইন পোর্টাল থেকে ডাউনলোড ও প্রিন্ট করতে পারবে।
পরীক্ষার চূড়ান্ত রুটিন ও সময়সূচি
প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর থেকে প্রাপ্ত তথ্যানুয়ায়ী, ২০২৬ সালের প্রাথমিক বৃত্তি পরীক্ষা আগামী ১৫ এপ্রিল থেকে শুরু হতে যাচ্ছে। চূড়ান্ত রুটিন নিম্নরূপ:
| তারিখ | পরীক্ষার বিষয় | নম্বর |
| ১৫ এপ্রিল ২০২৬ | বাংলা | ১০০ |
| ১৬ এপ্রিল ২০২৬ | ইংরেজি | ১০০ |
| ১৭ এপ্রিল ২০২৬ | প্রাথমিক গণিত | ১০০ |
| ১৮ এপ্রিল ২০২৬ | প্রাথমিক বিজ্ঞান এবং বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয় | ১০০ |
(উল্লেখ্য যে, পার্বত্য জেলাগুলোর—রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবান—ক্ষেত্রে স্থানীয় আইন-শৃঙ্খলা ও ভৌগোলিক পরিস্থিতির কারণে সময়সূচিতে কিছুটা পরিবর্তন হতে পারে)।
কোটা, বৃত্তির হার ও অংশগ্রহণ নীতি
নতুন নীতিমালা অনুযায়ী, মেধা তালিকায় ছাত্র ও ছাত্রীদের সমানুপাতিক হারে (৫০ শতাংশ করে) নির্বাচন করা হবে।
- সরকারি বনাম বেসরকারি কোটা: মোট বৃত্তির ৮০ শতাংশ সংরক্ষিত থাকবে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের জন্য এবং অবশিষ্ট ২০ শতাংশ বরাদ্দ থাকবে কিন্ডারগার্টেনসহ অন্যান্য বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের জন্য।
- অংশগ্রহণের যোগ্যতা: পঞ্চম শ্রেণিতে অধ্যয়নরত সর্বোচ্চ ৪০ শতাংশ শিক্ষার্থী এই পরীক্ষায় অংশগ্রহণের সুযোগ পাবেন, যা তাদের চতুর্থ শ্রেণির বার্ষিক মূল্যায়নের ওপর ভিত্তি করে নির্ধারিত হবে।
১৮০ দিনের অগ্রাধিকার কর্মসূচি ও পরীক্ষা হলের ১০টি জরুরি নির্দেশনা
শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলনের ঘোষিত ১৮০ দিনের বিশেষ অগ্রাধিকার কর্মসূচির অন্যতম প্রধান স্তম্ভ হলো পরীক্ষা পদ্ধতির আধুনিকায়ন ও দালালের দৌরাত্ম্যমুক্ত স্বচ্ছ পরিবেশ তৈরি করা। পরীক্ষা কেন্দ্রে জালিয়াতি ও নকল রোধে প্রতিটি কক্ষে বাধ্যতামূলক সিসিটিভি ক্যামেরা মনিটরিং করা হবে। পরীক্ষার্থীদের জন্য অধিদপ্তর থেকে কিছু কড়া নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে:
- ওএমআর (OMR) শিট ও উত্তরপত্রে কোনো প্রকার কাটাকাটি বা ফ্লুইড ব্যবহার করা যাবে না।
- প্রবেশপত্র (Admit Card) ছাড়া কোনো অবস্থাতেই কোনো পরীক্ষার্থীকে কেন্দ্রে প্রবেশ করতে দেওয়া হবে না।
- পরীক্ষা শুরুর নির্ধারিত সময়ের অন্তত ৩০ মিনিট আগে প্রতিটি শিক্ষার্থীকে কেন্দ্রে উপস্থিত হতে হবে।
- পরীক্ষা কক্ষে ক্যালকুলেটর, মোবাইল ফোন, স্মার্ট ওয়াচ বা কোনো প্রকার ইলেকট্রনিক ডিভাইস সাথে রাখা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।
- মূল উত্তরপত্র জমা না দেওয়া পর্যন্ত বা পরীক্ষা শুরুর ন্যূনতম এক ঘণ্টা অতিবাহিত না হওয়া পর্যন্ত কেউ হল ত্যাগ করতে পারবে না।
- পরীক্ষা চলাকালীন বহিরাগতদের প্রবেশ রুখতে পরীক্ষা কেন্দ্রের চারপাশ ডিজিটাল ট্র্যাকিং ও কঠোর নজরদারিতে থাকবে।
- সুবিধাবঞ্চিত ২ লাখ শিক্ষার্থীর মাঝে সরকারের দেওয়া ফ্রি ড্রেস ও কেডস পরে শিক্ষার্থীরা সুশৃঙ্খলভাবে অংশ নিতে পারবে।
- পরীক্ষার হলে পরিদর্শকদের ডিউটি পালনে কোনো প্রকার অবহেলা বা টেবিল কালচার ধরা পড়লে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
- ডিজিটাল ফাইল ট্র্যাকিং সিস্টেমের মাধ্যমে পরীক্ষার ফলাফল দ্রুততম সময়ের মধ্যে প্রক্রিয়াকরণ করা হবে।
- পরীক্ষার্থীরা শুধুমাত্র সাধারণ কালো বলপয়েন্ট কলম এবং জ্যামিতিক বক্স ব্যবহারের সুযোগ পাবে।
শিক্ষক politics বনাম অ্যাকাডেমিক মূল্যায়ন ও জনমত
সাম্প্রতিক এক দেশব্যাপী জরিপের ফলাফলে দেখা গেছে, দেশের ৭৬ শতাংশ মানুষ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে রাজনৈতিক প্রভাব বা লেজুরবৃত্তির তীব্র বিপক্ষে মত দিয়েছেন। সরকার মনে করছে, নতুন এই ৪০০ নম্বরের কেন্দ্রীয় পরীক্ষা পদ্ধতির মাধ্যমে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কোনো প্রকার রাজনৈতিক তদবির বা স্বজনপ্রীতির সুযোগ থাকবে না। এনটিআরসিএ-র মাধ্যমে সদ্য নিয়োগ প্রক্রিয়ার চূড়ান্ত ধাপে থাকা ১২,৯৫১ জন সৎ ও দক্ষ প্রতিষ্ঠান প্রধানরা পরীক্ষা কেন্দ্রগুলোতে সম্পূর্ণ রাজনীতিমুক্ত ও আদর্শ পরিবেশ বজায় রাখতে বড় ভূমিকা রাখবেন। (উল্লেখ্য যে, সম্প্রতি সরকারি চাকরির বয়সসীমা ৩২ বছর করার ঐতিহাসিক সিদ্ধান্তের ফলে শিক্ষা প্রশাসনে একঝাঁক তরুণ ও আইটি-দক্ষ কর্মকর্তা যুক্ত হয়েছেন, যারা এই ডিজিটাল রূপান্তর তদারকি করছেন)।
FAQ – সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্নাবলী
প্রশ্ন ১: বৃত্তি পরীক্ষায় পাস করার জন্য সর্বনিম্ন কত নম্বর পেতে হবে?
উত্তর: নতুন নীতিমালা অনুযায়ী, বৃত্তি পাওয়ার যোগ্য হিসেবে বিবেচিত হতে একজন শিক্ষার্থীকে প্রতিটি বিষয়ে পৃথক পৃথকভাবে ন্যূনতম ৪০ শতাংশ নম্বর পেতে হবে।
প্রশ্ন ২: শিক্ষার্থীরা কবে থেকে প্রবেশপত্র সংগ্রহ করতে পারবে?
উত্তর: শিক্ষার্থীরা তাদের প্রবেশপত্র আগামী ৬ এপ্রিল থেকে ১৩ এপ্রিল ২০২৬ তারিখের মধ্যে অনলাইনে ডাউনলোড ও প্রিন্ট করতে পারবে।
উপসংহার: মেধাবী জাতি গড়ার লক্ষে এক ধাপ এগিয়ে
শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলনের বিশেষ তত্ত্বাবধান ও বলিষ্ঠ নেতৃত্বে প্রণীত এই নতুন নীতিমালা দেশের প্রাথমিক শিক্ষার গুণগত মান বৃদ্ধিতে এক যুগান্তকারী ভূমিকা পালন করবে। আধুনিক মান বণ্টন এবং প্রযুক্তিনির্ভর মনিটরিংয়ের মাধ্যমে ২০ Eskimo৬ ও ২০ Eskimo৭ সালের শিক্ষা সংস্কার কার্যক্রম আরও গতিশীল হবে। অভিভাবক ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রধানদের প্রতি অনুরোধ, কোনো প্রকার গুজবে কান না দিয়ে নতুন এই সময়সূচি ও নিয়মাবলী অনুযায়ী দ্রুত শিক্ষার্থীদের চূড়ান্ত প্রস্তুতি ও অনলাইন ডাটা যাচাই সম্পন্ন করুন।
