শিক্ষা বোর্ডগুলোর বিরুদ্ধে শিক্ষকদের গুরুতর অভিযোগ: সম্মানী না দিয়ে ব্যাংক সুদে মুনাফা লুটছেন কর্মকর্তারা!
দেশের শিক্ষা বোর্ডগুলোর বিরুদ্ধে পরীক্ষকদের পারিশ্রমিক বা সম্মানী নিয়ে এক নজিরবিহীন দুর্নীতির অভিযোগ তুলেছেন মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষকরা। অভিযোগ উঠেছে, এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষার উত্তরপত্র মূল্যায়নের সম্মানী সময়মতো পরিশোধ না করে সেই বিশাল অংকের টাকা ব্যাংকে ফেলে রেখে মোটা অংকের সুদ বা মুনাফা লুটছেন বোর্ড কর্মকর্তারা। নিয়ম অনুযায়ী পরীক্ষা শেষ হওয়ার দ্রুততম সময়ের মধ্যে টাকা পাওয়ার কথা থাকলেও, অনেক ক্ষেত্রে শিক্ষকদের দুই থেকে তিন বছর পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হচ্ছে। এই চরম অবহেলা ও বঞ্চনার প্রতিবাদে অনেক শিক্ষক এখন পাবলিক পরীক্ষার উত্তরপত্র মূল্যায়নে অনীহা প্রকাশ করছেন।
শিক্ষকদের সম্মানী ও বোর্ড কর্মকর্তাদের মুনাফাখোরি
শিক্ষকদের মতে, এসএসসি বা এইচএসসি পরীক্ষার ফরম পূরণের (Form Fill-up) সময় পরীক্ষা শুরুর অন্তত তিন মাস আগেই শিক্ষা বোর্ডগুলোর অ্যাকাউন্টে কোটি কোটি টাকা জমা হয়। অভিযোগ রয়েছে, এই বিশাল অংকের টাকা বোর্ড কর্তৃপক্ষ বিভিন্ন মেয়াদী ফিক্সড ডিপোজিট বা নির্দিষ্ট অ্যাকাউন্টে লগ্নি করে মুনাফার অংক বাড়াতে থাকে। অথচ যাদের পরিশ্রমে পরীক্ষার ফলাফল তৈরি হয়, সেই শিক্ষকদের পাওনা বুঝিয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে বোর্ডগুলো চরম উদাসীনতা প্রদর্শন করছে।
শিক্ষকদের মূল অভিযোগসমূহ:
- দীর্ঘসূত্রতা: পাওনা টাকা পেতে দুই থেকে তিন বছর পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়।
- অমানবিক আচরণ: দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির বাজারে শিক্ষকদের পারিশ্রমিক আটকে রাখা।
- ডিজিটাল পেমেন্টে অনীহা: দ্রুত টাকা পাঠানোর প্রযুক্তি থাকলেও ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে টাকা পাঠিয়ে ব্যাংকে সময়ক্ষেপণ করা।
- সুদখোরি মনোভাব: শিক্ষকদের টাকা ব্যাংকে রেখে লভ্যাংশ পকেটে ভরা।
সম্মানী কিছুটা বাড়লেও ক্ষোভ কমেনি
ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রকের অফিস সূত্রে জানা গেছে, এবার উত্তরপত্র মূল্যায়নের সম্মানী কিছুটা বৃদ্ধি করা হয়েছে। তবে শিক্ষকদের মতে, এই সামান্য বৃদ্ধি বর্তমান বাজার পরিস্থিতির তুলনায় নগণ্য এবং পরিশোধের দীর্ঘসূত্রতা এই উদ্যোগকে ম্লান করে দিয়েছে।
বর্তমান সম্মানীর হার (তথ্য অনুযায়ী):
| পদের নাম | পূর্বের সম্মানী (প্রতি খাতা) | বর্তমান সম্মানী (প্রতি খাতা) |
| পরীক্ষক (Examiner) | ৩৫ টাকা | ৪৫ টাকা |
| প্রধান পরীক্ষক (Head Examiner) | ৩ টাকা | ৪ টাকা |
শিক্ষকদের দাবি, বোর্ড কর্মকর্তারা যখন বিদেশ সফর বা বিলাসিতা করেন তখন টাকার অভাব হয় না, কিন্তু শিক্ষকদের পাওনা দেওয়ার সময় নানা অজুহাত দাঁড় করানো হয়। সম্মানীর টাকা সরাসরি ব্যাংক অ্যাকাউন্টে (EFT) পাঠানোর সুযোগ থাকলেও বোর্ডগুলো তা করছে না।
শিক্ষা ব্যবস্থার ওপর দীর্ঘমেয়াদী নেতিবাচক প্রভাব
পরীক্ষকদের সম্মানী নিয়ে এই ধরণের অনিয়ম আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার নৈতিক ভিত্তিকেই দুর্বল করে দিচ্ছে। শিক্ষকরা যখন দেখেন তাদের কষ্টের টাকা দিয়ে বোর্ড কর্মকর্তারা লাভবান হচ্ছেন, তখন তারা কাজের প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন।
সম্ভাব্য ঝুঁকি ও প্রভাব:
১. মূল্যায়নের মান হ্রাস: বিরক্ত বা হতাশ শিক্ষক সঠিকভাবে খাতা মূল্যায়ন না করলে শিক্ষার্থীদের ফলাফল ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
২. পরীক্ষা পরিচালনায় সংকট: শিক্ষকরা উত্তরপত্র সংগ্রহ করা থেকে বিরত থাকলে পাবলিক পরীক্ষা পরিচালনা দুরূহ হয়ে পড়বে।
৩. আস্থাহীনতা: শিক্ষা বোর্ডগুলোর প্রতি শিক্ষকদের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ প্রাতিষ্ঠানিক শৃঙ্খলার জন্য বড় হুমকি।
৪. দুর্নীতির বিস্তার: সময়মতো পাওনা না দেওয়া প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতির একটি অংশ হিসেবে গণ্য হচ্ছে।
দ্রুত সমাধান ও শিক্ষকদের প্রস্তাবনা
শিক্ষক সমাজ এবং শিক্ষা সচেতন নাগরিকরা এই সংকট নিরসনে দ্রুত হস্তক্ষেপ দাবি করেছেন। বোর্ডগুলোকে বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের মতো পরিচালনা না করে শিক্ষকদের অধিকার নিশ্চিত করার আহ্বান জানানো হয়েছে।
সমাধানের জন্য প্রয়োজনীয় ধাপসমূহ:
- ডিজিটাল পেমেন্ট সিস্টেম: ম্যানুয়াল চেক পদ্ধতি বাতিল করে সরাসরি ‘ইলেকট্রনিক ফান্ড ট্রান্সফার’ (EFT) এর মাধ্যমে টাকা পাঠানো।
- নির্ধারিত সময়সীমা: ফলাফল প্রকাশের ১৫ থেকে ৩০ দিনের মধ্যে সম্মানীর টাকা পরিশোধ বাধ্যতামূলক করা।
- স্বচ্ছতা ও অডিট: শিক্ষকদের জমানো টাকার সুদ বা মুনাফা কোথায় যাচ্ছে, তা নিয়ে উচ্চপর্যায়ের তদন্ত ও অডিট করা।
- বিভাগীয় ব্যবস্থা: সম্মানী আটকে রাখা কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ও আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ।
FAQ – সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্নাবলী
প্রশ্ন ১: শিক্ষকদের সম্মানী পেতে সাধারণত কতদিন সময় লাগে?
উত্তর: নিয়ম অনুযায়ী ফলাফল প্রকাশের পর দ্রুত পাওয়ার কথা থাকলেও, শিক্ষকদের অভিযোগ অনুযায়ী বর্তমানে ২ থেকে ৩ বছর পর্যন্ত সময় লেগে যাচ্ছে।
প্রশ্ন ২: শিক্ষা বোর্ডগুলো কি ডিজিটাল মাধ্যমে টাকা পাঠাতে পারে না?
উত্তর: অবশ্যই পারে। বাংলাদেশের সকল সরকারি লেনদেন এখন ডিজিটাল পদ্ধতিতে হচ্ছে, কিন্তু বোর্ডগুলো টাকা ব্যাংকে বেশি সময় রাখার স্বার্থে এটি এড়িয়ে চলছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
উপসংহার
পরীক্ষকদের সম্মানীর টাকা নিয়ে যে অনিয়ম ও মুনাফাখোরির অভিযোগ উঠেছে, তা কেবল দুঃখজনক নয় বরং চূড়ান্ত নিন্দনীয়। শিক্ষকদের মেধা ও শ্রমের বিনিময় দ্রুত পরিশোধ করা কেবল প্রশাসনিক দায়িত্ব নয়, এটি একটি নৈতিক বাধ্যবাধকতা। আমরা আশা করি, শিক্ষা মন্ত্রণালয় এই বিষয়ে দ্রুত হস্তক্ষেপ করবে এবং শিক্ষকদের পাওনা সরাসরি ব্যাংক অ্যাকাউন্টে পাঠিয়ে এই দীর্ঘসূত্রতার অবসান ঘটাবে। শিক্ষকদের ন্যায্য পাওনা বুঝিয়ে দেওয়াই হোক শিক্ষা বোর্ডের প্রথম অগ্রাধিকার।
শিক্ষা সংবাদ, শিক্ষা বোর্ড আপডেট ২০২৬ এবং শিক্ষকদের অধিকার সংক্রান্ত সকল ব্রেকিং নিউজ সবার আগে দ্রুত পেতে নিয়মিত আমাদের ওয়েবসাইটের সাথেই থাকুন। ধন্যবাদ।
