শিক্ষা

সামান্য বৃষ্টিতেই জলমগ্ন দেশের শতশত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান: ব্যাহত হচ্ছে পাঠদান, বাড়ছে স্বাস্থ্য ঝুঁকি

বর্ষা মৌসুম শুরু হতে না হতেই দেশের অনেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে জলাবদ্ধতার সমস্যা প্রকট হয়ে দাঁড়িয়েছে। সামান্য বৃষ্টি হলেই স্কুলের মাঠ হাঁটু সমান পানিতে তলিয়ে যাচ্ছে, যার ফলে ব্যাহত হচ্ছে স্বাভাবিক পাঠদান কার্যক্রম। জলমগ্ন মাঠ পেরিয়ে শ্রেণীকক্ষে প্রবেশ করা শিক্ষার্থীদের জন্য যেমন ঝুঁকিপূর্ণ, তেমনি শিক্ষকদের জন্যও এটি এক বড় বিড়ম্বনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই পরিস্থিতির ফলে গ্রামীণ ও শহরতলীর শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে শিক্ষা কার্যক্রম স্থবির হয়ে পড়ার উপক্রম হয়েছে।

জলাবদ্ধতায় স্থবির শিক্ষা কার্যক্রম ও অবকাঠামোগত ক্ষতি

জলাবদ্ধতার কারণে অনেক সময় স্কুলের প্রাত্যহিক সমাবেশ (অ্যাসেম্বলি) বন্ধ রাখতে হচ্ছে। শিক্ষার্থীরা দীর্ঘ সময় ধরে জলাবদ্ধ মাঠে খেলাধুলা বা চলাফেরা করতে পারছে না, যা তাদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশে বাধা সৃষ্টি করছে। সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর বর্তমান চিত্র নিচে তুলে ধরা হলো:

  • শ্রেণীকক্ষে জলাবদ্ধতা: অনেক বিদ্যালয়ে দেখা গেছে, বৃষ্টির পানি দীর্ঘ সময় জমে থাকায় শ্রেণীকক্ষের দেয়ালে ড্যাম্প পড়ে আসবাবপত্র নষ্ট হচ্ছে।
  • অ্যাসেম্বলি বন্ধ: মাঠ পানিতে ডুবে থাকায় জাতীয় সংগীত পরিবেশন ও শারীরিক কসরত করা সম্ভব হচ্ছে না।
  • আসবাবপত্রের ক্ষতি: পানির আর্দ্রতায় বেঞ্চ, টেবিল এবং আলমারি দ্রুত নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।
  • ড্রেনেজ সমস্যা: স্থানীয়দের অভিযোগ, অপরিকল্পিত ড্রেনেজ ব্যবস্থা (Drainage System) এবং স্কুলের আশেপাশের জমি ভরাট করার ফলেই এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।

স্বাস্থ্য ঝুঁকি ও শিক্ষার্থীদের উপস্থিতিতে নেতিবাচক প্রভাব

স্কুলের মাঠে জমে থাকা পানি কেবল চলাচলের সমস্যাই তৈরি করছে না, বরং এটি মারাত্মক স্বাস্থ্য ঝুঁকির কারণ হয়ে উঠছে। বিশেষ করে বর্ষাকালে ডেঙ্গু ও পানিবাহিত রোগের প্রাদুর্ভাব বাড়ে। জলাবদ্ধতার ফলে সৃষ্ট স্বাস্থ্য সমস্যাগুলো হলো:

১. মশার উপদ্রব: জমে থাকা নোংরা পানি থেকে এডিস মশা ও কিউলেক্স মশার বিস্তার ঘটছে, যা ডেঙ্গু ও ম্যালেরিয়ার ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।

২. পানিবাহিত রোগ: নোংরা পানির সংস্পর্শে শিক্ষার্থীদের মধ্যে ডায়রিয়া ও চর্মরোগের প্রকোপ দেখা দিচ্ছে।

৩. উপস্থিতি হ্রাস: অভিভাবকরা সংক্রমণের ভয়ে সন্তানদের স্কুলে পাঠাতে নিরুৎসাহিত বোধ করছেন, ফলে উপস্থিতির হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাচ্ছে।

৪. দুর্ঘটনার ঝুঁকি: জলমগ্ন মাঠ পার হতে গিয়ে অনেক শিক্ষার্থী পিছলে পড়ে আহত হচ্ছে, এতে তাদের বইখাতা ও স্কুল ড্রেস নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।

অবকাঠামো উন্নয়ন ও কর্তৃপক্ষের আশু করণীয়

জলাবদ্ধতা নিরসনে সংশ্লিষ্ট শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পরিচালনা কমিটি এবং স্থানীয় প্রশাসনের কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া এখন সময়ের দাবি। প্রয়োজনীয় বাজেট বরাদ্দ এবং দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনার মাধ্যমে এই সমস্যার সমাধান সম্ভব। শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তর (EED) এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের জন্য জরুরি সুপারিশসমূহ:

  • মাঠ ভরাট: নিচু মাঠগুলো বালু ভরাট করে পার্শ্ববর্তী রাস্তা থেকে উঁচু করতে হবে।
  • টেকসই ড্রেনেজ: পানি নিষ্কাশনের জন্য প্রশস্ত ও উন্নত ড্রেনেজ সিস্টেম স্থাপন করতে হবে।
  • জরুরি সংস্কার: বর্ষা শুরুর আগেই জরাজীর্ণ ভবন ও ড্রেন পরিষ্কারের উদ্যোগ নিতে হবে।
  • তহবিল বরাদ্দ: প্রতিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের জরুরি সংস্কারের জন্য বিশেষ তহবিল বা বাজেট বরাদ্দ করা প্রয়োজন।

স্থানীয় সচেতনতা ও নাগরিক উদ্যোগ

কেবল সরকারি সহায়তার অপেক্ষায় না থেকে স্থানীয় সচেতন নাগরিক সমাজ ও প্রাক্তন শিক্ষার্থীরাও এই সমস্যা সমাধানে ভূমিকা রাখতে পারেন। অনেক এলাকায় দেখা গেছে, এলাকাবাসীর স্বেচ্ছাশ্রমে ড্রেন পরিষ্কার করার ফলে জলাবদ্ধতা অনেকটাই কমে এসেছে। স্কুল ম্যানেজিং কমিটি (SMC) এবং অভিভাবক-শিক্ষক সমিতি (PTA) মিটিংয়ে এই বিষয়টি গুরুত্বের সাথে আলোচনা করা উচিত। প্রাকৃতিক জলাধার রক্ষা এবং পরিকল্পিত নগরায়ন না হলে এই জলাবদ্ধতা সমস্যা ভবিষ্যতে আরও প্রকট হবে। একটি শিশুবান্ধব ও নিরাপদ স্কুল প্রাঙ্গণ গড়ে তোলাই হোক আমাদের সবার অঙ্গীকার।

FAQ – সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্নাবলী

প্রশ্ন ১: জলাবদ্ধতার কারণে স্কুল বন্ধ রাখার কোনো সরকারি নির্দেশনা আছে কি?

উত্তর: যদি জলাবদ্ধতা অত্যন্ত ভয়াবহ রূপ নেয় এবং শিক্ষার্থীদের যাতায়াত জীবনের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হয়, তবে স্থানীয় শিক্ষা অফিস বা জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসারের অনুমতি সাপেক্ষে সাময়িকভাবে পাঠদান স্থগিত রাখা যেতে পারে।

প্রশ্ন ২: স্কুলের জলাবদ্ধতা নিরসনে কার কাছে অভিযোগ করতে হবে?

উত্তর: প্রথমে স্কুল ম্যানেজিং কমিটিকে বিষয়টি জানাতে হবে। তারা উপজেলা শিক্ষা অফিসার (UEO) বা উপজেলা নির্বাহী অফিসার (UNO)-এর কাছে লিখিতভাবে আবেদন করবেন। এছাড়া শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরেও অবকাঠামোগত উন্নয়নের জন্য আবেদন করা যায়।

উপসংহার

সামান্য বৃষ্টিতে স্কুলের মাঠ জলমগ্ন হওয়া আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার অবকাঠামোগত দুর্বলতারই প্রতিফলন। শিক্ষার্থীদের সুস্বাস্থ্য ও নিরবিচ্ছিন্ন পাঠদান নিশ্চিত করতে জলাবদ্ধতা দূর করার কোনো বিকল্প নেই। শিক্ষার পরিবেশ সুন্দর রাখা আমাদের সকলের নৈতিক দায়িত্ব। আমরা আশা করি, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দ্রুত এই সমস্যা সমাধানে কার্যকর পদক্ষেপ নেবেন এবং আসন্ন বর্ষার আগেই পানি নিষ্কাশনের সঠিক পথ উন্মুক্ত করবেন।

জলাবদ্ধতামুক্ত ও দূষণমুক্ত পরিবেশেই গড়ে উঠুক আমাদের আগামীর স্মার্ট প্রজন্ম। দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার প্রতিটি আপডেট এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের উন্নয়ন সংবাদ সবার আগে পেতে নিয়মিত আমাদের পোর্টাল ভিজিট করুন। ধন্যবাদ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *