এনটিআরসিএ-র বিতর্কিত কর্মকর্তা ফিরোজ আহমেদের পদোন্নতি প্রক্রিয়া শুরু: শিক্ষা প্রশাসনে তীব্র ক্ষোভ
বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষের (NTRC) বিতর্কিত কর্মকর্তা ফিরোজ আহমেদকে উপপরিচালক (Deputy Director) পদে বসানোর প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। দীর্ঘ ৯ বছর ধরে একই প্রতিষ্ঠানে প্রভাব বিস্তার করে থাকা এই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অতীতে নানা অনিয়ম, দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের গুরুতর অভিযোগ রয়েছে। গত ৯ মে ২০২৬ তারিখে প্রকাশিত তথ্যে জানা গেছে, সদ্য বিদায়ী বিতর্কিত চেয়ারম্যানের সুপারিশে তাকে এই গুরুত্বপূর্ণ পদে পদায়নের জন্য শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠানো হয়েছে। সচিবের নির্দেশ অমান্য করে এমন পদায়নের উদ্যোগে সাধারণ শিক্ষক ও চাকরিপ্রার্থীদের মধ্যে তীব্র অসন্তোষ দেখা দিয়েছে।
ফিরোজ আহমেদের বিরুদ্ধে ওঠা গুরুতর অভিযোগসমূহ
অভিযোগ রয়েছে যে, ফিরোজ আহমেদ বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে প্রভাব খাটিয়ে এনটিআরসিএ-তে নিজের অবস্থান শক্ত করেন। শিক্ষক নিবন্ধন পরীক্ষা (Teacher Registration Exam), নিয়োগ সুপারিশ এবং সনদ যাচাইয়ের মতো স্পর্শকটতর কার্যক্রমগুলোতে তাঁর একচ্ছত্র আধিপত্য ছিল।
অভিযোগের মূল দিকসমূহ:
- দীর্ঘস্থায়ী অবস্থান: সরকারি নিয়ম উপেক্ষা করে গত ৯ বছর ধরে তিনি একই প্রতিষ্ঠানে কর্মরত আছেন।
- ক্ষমতার অপব্যবহার: নিয়োগ সুপারিশ এবং সনদ যাচাইয়ের ক্ষেত্রে স্বজনপ্রীতি ও অনিয়মের অভিযোগ।
- সচিবের নির্দেশ অমান্য: শিক্ষা সচিব আব্দুল খালেক স্পষ্টভাবে জানিয়েছিলেন যে, এনটিআরসিএ-তে দুই বছরের বেশি কেউ থাকতে পারবে না। অথচ ফিরোজ আহমেদের ক্ষেত্রে এই নিয়মের ব্যত্যয় ঘটছে।
- রাজনৈতিক প্রভাব: সাবেক ফ্যাসিস্ট সরকারের আমলে প্রভাব খাটিয়ে নিজের স্বার্থ হাসিলের অভিযোগ রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে।
এনটিআরসিএ-র যুক্তি ও জরুরি পদায়নের নেপথ্যে
এনটিআরসিএ-র পক্ষ থেকে এই পদায়নকে ‘জরুরি’ হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। বর্তমানে এনটিআরসিএ-তে উপপরিচালকের ৪টি পদের মধ্যে কয়েকটি শূন্য থাকায় প্রশাসনিক কাজে স্থবিরতা দেখা দিচ্ছে বলে দাবি করা হচ্ছে।
যেসব কারণে পদায়ন জরুরি বলা হচ্ছে:
১. মৌখিক পরীক্ষা: ৮ম এনটিআরসিএ নিয়োগ পরীক্ষা-২০২৬ (প্রতিষ্ঠান প্রধান ও সহকারী প্রধান) এর ভাইভা কার্যক্রম পরিচালনা।
২. সনদ যাচাই: ১ম থেকে ১৮তম শিক্ষক নিবন্ধন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ প্রার্থীদের ৩৬ হাজার ৪৮৮টি পদের সনদ যাচাইয়ের বিশাল কাজ সম্পন্ন করা।
৩. শূণ্য পদ পূরণ: অধ্যাপক দীনা পারভীনকে ওএসডি করার পর থেকে খালি পড়ে থাকা উপপরিচালক পদটি দ্রুত পূরণ করা।
তবে প্রশ্ন উঠেছে, হাজার হাজার বিসিএস সাধারণ শিক্ষা ক্যাডার কর্মকর্তা থাকা সত্ত্বেও কেন বারবার বিতর্কে জড়ানো ফিরোজ আহমেদকেই এই পদের জন্য বেছে নেওয়া হচ্ছে?
নিয়োগ প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও আস্থার সংকট
সদ্য বিদায়ী চেয়ারম্যান আমিনুল ইসলাম তাঁর মেয়াদের শেষ সময়ে ফিরোজ আহমেদের জন্য জোর সুপারিশ করে গেছেন। বর্তমানে এনটিআরসিএ-তে প্রতিষ্ঠান প্রধান নিয়োগের ভাইভা শুরু করার পরিকল্পনা থাকলেও নানা আইনি জটিলতা ও প্রশাসনিক বিতর্কের কারণে তা অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। এই পরিস্থিতিতে বিতর্কিত কাউকে গুরুত্বপূর্ণ পদে বসানো হলে পুরো নিয়োগ প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। লক্ষ লক্ষ চাকরিপ্রার্থীর ভবিষ্যৎ যেখানে জড়িত, সেখানে এমন বিতর্কিত সিদ্ধান্ত সাধারণ প্রার্থীদের মধ্যে আস্থার সংকট তৈরি করছে।
গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা ও সতর্কতা
এনটিআরসিএ সংক্রান্ত যে কোনো নিয়োগ বা প্রশাসনিক রদবদল সম্পর্কে প্রার্থীদের সচেতন থাকা জরুরি:
- অফিসিয়াল বিজ্ঞপ্তির বাইরে কোনো ব্যক্তিগত লেনদেন বা তদবিরে বিশ্বাস করবেন না।
- নিয়োগ সংক্রান্ত যে কোনো তথ্যের জন্য এনটিআরসিএ-র অফিসিয়াল ওয়েবসাইট (অফিসিয়াল ওয়েবসাইট) নিয়মিত ভিজিট করুন।
- প্রশাসনিক অনিয়ম লক্ষ্য করলে যথাযথ কর্তৃপক্ষ বা শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অভিযোগ সেলে অবহিত করুন।
FAQ – সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্নাবলী
প্রশ্ন ১: একজন কর্মকর্তা এনটিআরসিএ-তে সর্বোচ্চ কত বছর থাকতে পারেন?
উত্তর: শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সচিবের নির্দেশনা অনুযায়ী, কোনো কর্মকর্তা বা কর্মচারী এনটিআরসিএ-তে একটানা দুই বছরের বেশি অবস্থান করতে পারবেন না।
প্রশ্ন ২: বিতর্কিত কর্মকর্তার পদোন্নতি হলে নিয়োগ পরীক্ষায় কী প্রভাব পড়তে পারে?
উত্তর: নীতিনির্ধারণী পদে বিতর্কিত ব্যক্তি থাকলে নিয়োগ প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ব্যাহত হতে পারে এবং যোগ্য প্রার্থীরা বঞ্চিত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়।
উপসংহার
এনটিআরসিএ-র বিতর্কিত কর্মকর্তা ফিরোজ আহমেদের উপপরিচালক হওয়ার প্রক্রিয়াটি দেশের শিক্ষা খাতের স্বচ্ছতার জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ। দুর্নীতিমুক্ত বাংলাদেশ গড়তে হলে প্রতিটি প্রশাসনিক স্তরে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা অপরিহার্য। যদি নিয়ম ভেঙে বিতর্কিত কাউকে পদায়ন করা হয়, তবে তা বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-শিক্ষক সমাজের আকাঙ্ক্ষার পরিপন্থী হবে। আমরা আশা করি, শিক্ষা মন্ত্রণালয় সকল বিতর্কের ঊর্ধ্বে উঠে একজন সৎ ও দক্ষ কর্মকর্তাকে এই পদে নিয়োগ দেবে। মেধা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে শিক্ষক নিয়োগের মাধ্যমে দেশের শিক্ষা ব্যবস্থাকে কলঙ্কমুক্ত করা এখন সময়ের দাবি।
এনটিআরসিএ-র সর্বশেষ খবর ও শিক্ষা ক্যাডার সংক্রান্ত সকল আপডেট সবার আগে দ্রুত পেতে নিয়মিত আমাদের সাথেই থাকুন। ধন্যবাদ।
