রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে পছন্দের প্রার্থীকে নিয়োগ দিতে একক ভাইভা গ্রহণের অভিযোগ: মেধার অবমূল্যায়নের আশঙ্কা
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে (রাবি) শিক্ষক ও কর্মকর্তা নিয়োগে স্বচ্ছতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগ উঠেছে যে, নির্দিষ্ট একজন পছন্দের প্রার্থীকে নিয়োগ দেওয়ার পথ প্রশস্ত করতে কেবল ‘একক ভাইভা’ বা সাক্ষাৎকার গ্রহণ করা হয়েছে। ১০ মে ২০২৬ তারিখে বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি নির্দিষ্ট বিভাগের নিয়োগ প্রক্রিয়া চলাকালীন এই ঘটনাটি জানাজানি হলে ক্যাম্পাসে এবং শিক্ষা সংশ্লিষ্ট মহলে ব্যাপক সমালোচনার সৃষ্টি হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো একটি স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানে এমন অস্বচ্ছ নিয়োগ প্রক্রিয়া মেধার অবমূল্যায়ন এবং প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতির ইঙ্গিত দিচ্ছে বলে মনে করছেন জ্যেষ্ঠ শিক্ষকরা।
নিয়োগ বোর্ডের ভূমিকা ও প্রশাসনিক অস্বচ্ছতার অভিযোগ
অনুসন্ধানে জানা গেছে, ওই নির্দিষ্ট প্রার্থীর সাথে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রভাবশালী মহলের ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, কৌশলে অন্য যোগ্য প্রার্থীদের বাদ দিয়ে বা তাদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত না করে কেবল একজনের ভাইভা নেওয়া হয়েছে। এমনকি ভাইভা বোর্ডের সময় এমনভাবে নির্ধারণ করা হয়েছিল যাতে অন্য প্রার্থীরা উপস্থিত হতে না পারেন অথবা তাদের আবেদন আগেই বাতিল করে দেওয়া হয়।
অভিযোগের মূল দিকসমূহ:
- বিধি লঙ্ঘন: একক ভাইভা গ্রহণ সরকারি ও বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়োগ বিধিমালার পরিপন্থী।
- লোক দেখানো পরীক্ষা: কেবল একজনকে নিয়োগ দেওয়ার লক্ষ্য থাকলে বিজ্ঞপ্তি দিয়ে লোক দেখানো পরীক্ষার আয়োজন করা হয়েছে বলে শিক্ষকদের দাবি।
- নিরপেক্ষতার সংকট: নিয়োগ বোর্ডের সিদ্ধান্ত আগে থেকেই ঠিক করা ছিল এবং ভাইভা ছিল কেবল একটি আনুষ্ঠানিকতা।
- অতীত রেকর্ড: রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে অতীতেও নিয়োগ নিয়ে নানা কেলেঙ্কারি হওয়ায় বর্তমান প্রশাসনের এই পদক্ষেপে ক্ষোভ বেড়েছে।
দুর্নীতি বিরোধী শিক্ষক সমাজের প্রতিবাদ
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘দুর্নীতি বিরোধী শিক্ষক সমাজ’-এর পক্ষ থেকে এই ঘটনার তীব্র নিন্দা জানানো হয়েছে। তারা এক বিবৃতিতে বলেছেন, বর্তমান প্রশাসনের অধীনে পুনরায় এ ধরণের ‘পছন্দের প্রার্থী’ থিওরি কার্যকর হওয়া অত্যন্ত হতাশাজনক। তারা অবিলম্বে এই বিতর্কিত নিয়োগ প্রক্রিয়া স্থগিত করার দাবি জানিয়েছেন। সচেতন শিক্ষার্থীদের দাবি, নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ ডিজিটাল এবং স্বচ্ছ হতে হবে যাতে প্রতিটি ধাপের তথ্য সকলের কাছে স্পষ্ট থাকে।
নিয়োগ প্রক্রিয়ার সম্ভাব্য প্রভাব
উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যখন মেধার চেয়ে ব্যক্তিগত সম্পর্ক বা সুপারিশ নিয়োগের মানদণ্ড হয়, তখন তার দীর্ঘমেয়াদী নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।
১. মেধা পাচার (Brain Drain): যোগ্য প্রার্থীরা বঞ্চিত হলে তারা দেশত্যাগের সিদ্ধান্ত নেন।
২. শিক্ষার মান হ্রাস: অযোগ্য শিক্ষক নিয়োগের ফলে উচ্চশিক্ষার গুণগত মান নিম্নগামী হয়।
৩. আস্থার সংকট: বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়োগ বোর্ডের ওপর থেকে মেধাবী শিক্ষার্থীদের বিশ্বাস হারিয়ে যায়।
৪. প্রশাসনিক শৃঙ্খলা: এ ধরণের নিয়োগ প্রশাসনিক শৃঙ্খলার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা ও সতর্কতা
বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়োগ পরীক্ষা সংক্রান্ত কিছু বিষয় প্রার্থীদের জেনে রাখা জরুরি:
- যেকোনো পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়োগের ক্ষেত্রে বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী একাধিক প্রার্থীর সংক্ষিপ্ত তালিকা (Shortlist) এবং প্রতিযোগিতামূলক ভাইভা বাধ্যতামূলক।
- যদি কোনো নিয়োগ প্রক্রিয়ায় অনিয়ম পরিলক্ষিত হয়, তবে প্রার্থীরা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট বা আচার্যের (চ্যান্সেলর) দপ্তরে লিখিত অভিযোগ জানাতে পারেন।
- নিয়োগ সংক্রান্ত সর্বশেষ তথ্যের জন্য নিয়মিত বিশ্ববিদ্যালয়ের অফিসিয়াল ওয়েবসাইট (অফিসিয়াল ওয়েবসাইট) অনুসরণ করুন।
FAQ – সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্নাবলী
প্রশ্ন ১: বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়োগে ‘একক ভাইভা’ কি আইনত বৈধ?
উত্তর: সাধারণত একক ভাইভা গ্রহণের কোনো বিধান নেই। প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার মাধ্যমে মেধার যাচাই নিশ্চিত করা বিশ্ববিদ্যালয়ের সংবিধিবদ্ধ নিয়ম। কেবল বিশেষায়িত কোনো ক্ষেত্রে যোগ্য প্রার্থী একজন থাকলে ব্যতিক্রম হতে পারে, তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রে এটি অস্বচ্ছতার লক্ষণ।
প্রশ্ন ২: নিয়োগ প্রক্রিয়ায় অনিয়ম প্রমাণিত হলে কী ব্যবস্থা নেওয়া যায়?
উত্তর: নিয়োগ প্রক্রিয়ায় অনিয়ম প্রমাণিত হলে উচ্চ আদালত বা আচার্যের নির্দেশে উক্ত নিয়োগ বাতিল করা হতে পারে এবং সংশ্লিষ্ট বোর্ড মেম্বারদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব।
উপসংহার
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে পছন্দের প্রার্থীকে নিয়োগ দিতে একক ভাইভা গ্রহণের খবরটি অত্যন্ত উদ্বেগজনক। শিক্ষক যখন রক্ষক হয়ে ভক্ষকের ভূমিকা পালন করেন, তখন শিক্ষা ব্যবস্থার ওপর মানুষের আস্থা নষ্ট হয়। একটি বৈষম্যহীন ও সমৃদ্ধ দেশ গড়তে হলে সকল প্রকার স্বজনপ্রীতি ও দুর্নীতির ঊর্ধ্বে উঠে নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা আবশ্যক। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের উচিত এই অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্ত করে পুনরায় স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় পরীক্ষা নেওয়া। মেধা ও সততার মূল্যায়নই পারে বিশ্ববিদ্যালয়ের মর্যাদা রক্ষা করতে।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়োগ সংক্রান্ত সকল ব্রেকিং নিউজ ও শিক্ষা খবরের আপডেট সবার আগে পেতে নিয়মিত আমাদের সাথেই থাকুন। ধন্যবাদ।
